Wapislam Banner

হজ্জের মাসায়লে


এখানে সহজ ভাবে হজ্ব করার পদ্ধতি আলোচনা করা হবে।
আমরা এখানে বেশী গুরুত্ব দিব ফরজ এবং ওয়াজিবগুলোর মধ্যে এবং সেই সমস্ত সুন্নতগুলো যেগুলো আদায় না করলে ফরজ বা ওয়াজেবের জন্য ক্ষতির কারণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। স্বাভাবিকভাবে হজ্বের বড় বড় আমলগুলো এরকমঃ এহরাম বাঁধা, মিনায় অবস্থান করা, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা, শয়তানকে পাথর মারা, কোরবানী করা, মাথার চুল হলক করা, তাওয়াফে জিয়ারত করা, সাই করা এবং বিদায়ী তাওয়াফ। এখন আমরা এটাকে বিস্তারিতিভাবে কিভাবে করতে হয় তা জানার চেষ্টা করব।
প্রথমে হচ্ছে এহরাম।  এহরাম শব্দটি এসেছে হারাম শব্দ থেকে। এহরাম মানে দুটো সাদা কাপড় পরে নিলাম তা নয়। এহরাম মানে আমি কিছু হালাল জিনিসকে হারাম করলাম এবং কিছু জিনিসের সংকল্প করলাম। যেগুলোকে আমি আজীবন ধরে রাখার চেষ্টা করবো। এটা সেলাই বিহীন। কাফনের কাপড় হিসাবেও এটাকে ব্যবহার করা হয়। এটার মানে হচ্ছে এরকম হয়ে গেলাম আমি এখন যেন মৃত হয়ে গেলাম এবং একজন মৃত ব্যক্তির যেরকম নাকি রাগ, ক্রোধ, হিংসা কিছুই থাকে না সেই রকম আমিও সেই রকম নিজেকে মৃত্যুর কাতারে ফেলে দিব। এটা মৃত্যুর আগেই মৃত্যুর এক পূর্ব প্রস্তুতি।
মানুষের কাছে বিদায় নিয়ে আসা, মানুষের কাছে মাফ চেয়ে আসা, মানুষের ঋণ আদায় করা, আমার যা ভুল আছে সেগুলোর ব্যাপারে মাফ চাওয়া এগুলোই এহরামের মূল শিক্ষা। গুনাহের কাজ সব সময়ই খারাপ। এহরাম অবস্থায় এগুলোর অভ্যাস করানো হচ্ছে যেন আমি গুনাহের কাজ, কবিরা গুনাহ্ ইত্যাদি থেকে কঠোর ভাবে বিরত থাকি এবং ভবিষ্যত জীবনে এর উপরেই জমে থাকতে পারি। কারণ হাদীসে আসে যে ব্যক্তি হজ্ব করে এবং তার অন্তরে যা আছে তার উপরেই সীল মোহর লাগিয়ে দেয়া হয়। এজন্য হজ্বের আগেই হজ্বের প্রস্তুতির মধ্যে এটা একটা নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করতে থাকা। শুধু কিছু নিয়ম কানুন পড়ে নিলাম এবং ঐ নিয়মের কিছু আমল করে নিলাম এটা হজ্বের মূল লক্ষ্য নয়।
এহরাম বাঁধার সাথে সাথে এই কথারও সংকল্প করা যে আমি অতীতের গুনাহ কে বর্জন করছি এবং ভবিষ্যতেও এটাকে না করার দৃঢ় সংকল্প করছি। মনে রাখবেন এহরাম শুরু হয় নিয়ত করা থেকে। এহরামের কাপড় পরা থেকে নয়। তাই এহরামের আগে কিছু সুন্নত আছে। গোসল করে নেয়া দুই রাকাত নামাজ পড়ে নেয়া। তারও আগে নিজের গোপন অঙ্গে যে লোম আছে তা পরিস্কার করে নেয়া। বোগল নাভির নিচের লোম পরিস্কার করা। সুগন্ধি ব্যবহার করা। মনে রাখবেন এই সবগুলিই সুন্নত। অনেক সময় আছেন মহিলারা বেশী বেশী ওমরাহ্ করার জন্য বার বার গোসল করে নিজেদের ঠান্ডা লাগিয়েও বসেন। যদি এটা সম্ভব হয় ভালো না হলে ওজু করে নিলেও সুন্নত আদায় হবে। পূর্বে উল্লেখিত সুন্নত আদায় করে দুই রাকাত নামাজ পড়ে এহরামের নিয়ত করা এবং লাব্বায়েক বলা। মনে রাখবেন এহরামের শুরু নিয়ত এবং লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক বলার সাথে সম্পৃক্ত তার আগে নয়। এহরামের নিয়ত যখন ইচ্ছা করা যায় তবে মিকাত অতিক্রমের পূর্বেই এহরামের নিয়ত করতে হয়। যারা প্রথমবার যাচ্ছেন তাদের জন্য এত লম্বা সময় এহরামকে ধরে রাখা কষ্টকর হতে পারে, কঠিন হতে পারে অথবা ভুলও হতে পারে। তাই সাবধানতা বশতঃ এয়ারপোর্টে এসে এহরামের নিয়ত করা যেতে পারে। নয়তো কেউ যদি হিম্মত করেন ঘরে থেকেই এই নামাজ পড়ে এহরামের নিয়ম করে আসতে তা আসতে পারেন। মনে রাখবেন এহরামের নিয়ত করে ওমরা বা হজ্ব করা ব্যতিত এহরাম খোলা যায় না। নিয়ত করার পূর্বে যে দুই রাকাত নামাজ তা টুপি পরেই আদায় করতে হয়। টুপি খুলে এহরামের নিয়ত করতে হয়। মহিলাদের জন্য এহরামের কোন নির্দিষ্ট কাপড় নেই। সতর ঢাকাটাই বাঞ্চনীয় এবং চেহারার উপরে কাপড় যেন লেগে না থাকে। কিন্তু চেহারাকে ঢেকে রাখতে হবে এমন ভাবে যেন ঐ পর্দা চেহারার সাথে না লাগে। যাহারা এহরাম বাঁধছেন তাদের নিয়ত হজ্ব এবং ওমরাহ নয় শুধু ওমরাহের নিয়ত তামাত্তু হজ্ব পালনকারীদের জন্য কিন্তু যদি এই রকম হয় যে, এই এহরামেই আমি ওমরাহ আদায় করছি এবং হজ্বও আদায় করবো তাহলেই শুধু মাত্র হজ্ব এবং ওমরাহের নিয়ত করতে হবে।

যেমনঃ কেউ মক্কাতে আগে গেল ওমরাহ করল পুনরায় মদীনাতে গেল মদীনা থেকে পুনারায় মক্কায় আসার সময়ও এহরাম করা অবস্থাতেই প্রবেশ করতে হবে এবং তিনি যদি চান ওমরাহ করে হালাল হবেন হতে পারবেন কিন্তু যদি এ কথার নিয়ত করে নেন যে আমি হজ্ব করব তাহলে হজ্ব করা ছাড়া এই এহরামকে খোলা যাবে না। এহরাম অবস্থা আল্লাহ্ তায়ালা বান্দার খুব পছন্দ করেন। এ কারণে এটার দোয়া কবুল হতেই থাকে কোন খারাপ চিন্তা যেন অন্তরে না আসে সে জন্য বেশী বেশী আল্লাহর কাছে দোয়া করা অবস্থা পরিবর্তনের সময় বেশী বেশী তালবিয়া লাব্বায়েক লা’শারিকা লাকা লাব্বায়েক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নেয়ামাত লাকা ওয়াল মুলক লা-শারীকা লাকা বেশী বেশী পড়তে থাকা। সকাল সন্ধ্যায়, উঠতে বসতে, বাহিরে যেতে, ভিতরে প্রবেশ করতে, লোকজনের সাথে সাক্ষাতের সময়, বিদায় নেওয়ার সময়, উপরে ওঠা, নিচে নামার সময় সব সময় বেশী থেকে বেশী তালবিয়া পড়া এবং এটাকে জোরে জোরে পড়ার কথা বলা হয়েছে। তালবিয়া মুখে উচ্চারণ করা শর্ত। শুধু মনে মনে পড়লে যথেষ্ট হবেনা এবং এটাকে অধিক পরিমাণে পড়া মুস্তাহাব তালবিয়া পাঠের সময় স্বর উচা করা সুন্নত এজন্য এটা এত উচ্চ স্বরে পড়বেন না যাতে নিজের, অন্য নামাজীর ও ঘুমন্ত ব্যক্তির অসুবিধা হতে পারে। মসজিদে হারামে, মীনা, আরাফত ও মুজদালেফায় তালবিয়া পাঠ করবেন কিন্তু মসজিদের ভিতরে জোরে পাঠ করবেন না। তাওয়াফ এবং সায়ী পালনের সময় তালবিয়া পাঠ করবেন না। মহিলাদের জন্য জোরে পাঠ করা নিষিদ্ধ। শুধু ওমরাহ করার সময় শুধু ওমরাহ করার নিয়ত করে আসেন তাহলে তালবিয়া পাঠ করতে থাকব যতক্ষণ না তাওয়াফ শুরু করি এবং হজ্বের সময় কঙ্কর নিক্ষেপ করার আগ পর্যন্ত  তালবিয়া পাঠ করতে হয়। যখন জামারায় আকবর অর্থাৎ বড় শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ করব তার আগে তালবিয়া পড়া বন্ধ করতে হবে। এরপর আর পড়া লাগবে না। ওমরার মধ্যেও তাওয়াফ শুরুর আগ পর্যন্ত তালবিয়া পড়া যায়। এহরাম অবস্থায় কম্বল, লেপ, কাথা, শাল ইত্যাদি গায়ে দেওয়া যায়েজ আছে। মাকরুহ ওয়াক্ত ব্যতিত যে কোন সময় এহরামের নিয়তে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা সুন্নত। যেহেতু হায়েজ নেফাসের সময় মহিলাদের জন্য নামাজ আদায় করা নিষিদ্ধ, তাই তারা ওজু গোসল করে কেবলামুখী হয়ে বসবেন এবং এহরামের নিয়তে তালবিয়া পাঠ করবেন, নামাজ পড়বেন না।
এহরাম বাধার পর মহিলাদের উপস্থিতিতে সহবাসের কথা বলাবলি করা সহবাসের উপভ্রান্তি যেমনঃ চুম্বন করা, কামভাব ও স্ত্রীকে স্পর্শ করা ইত্যাদি নিষিদ্ধ। যদিও পাপকার্য সর্বদাই হারাম তাই এহরাম অবস্থায় যেন পাপ কার্য সম্পাদন না করা হয় তার বিশেষভাবে চেষ্টা করা। সঙ্গী সাথীদের সাথে বা অপর কারো সাথে ঝগড়া বিবাদ করাও পুরাপুরি নিষিদ্ধ। এহরাম অবস্থায় জলজ প্রাণীও শিকার করা নিষিদ্ধ। এহরাম অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহার করা, নক ও চুল কাটা অথবা কাকে দিয়ে কাটানো। মাথা বা মুখ সম্পূর্ণ বা আংশিক দেখা থাকাও নিষিদ্ধ।
সেলাইযুক্ত কাপড় পরা যেমন কোর্তা, পায়জামা, টুপি, পাগড়ী, আসকান, দস্তানা, মোজা ইত্যাদি পরাও এরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ। এমন জোতা পরিধান করা নিষিদ্ধ যেটাতে পায়ের মধ্যবর্তী হাড় ঢাকা পড়ে যায়। তবে কোর্তা প্রভৃতিকে চাদরের গায়ে জড়ানো যায়েজ আছে। তবে তা থেকে বেঁচে থাকা উত্তম। মাথা বা মুখের উপরে পট্টি বাঁধাও নিষিদ্ধ। যদি একদিন ও একরাত বাঁধা থাকে আর তা কোন ঔষধের কারণে হয় তবুও সদকা ওয়াজিব হবে। এহরাম অবস্থায় কিছু মাকরুহ্ মানে অপছন্দীয় বিষয় যেটা করা হারাম না তবুও বিরত থাকাটাই আল্লাহ্ তায়ালা পছন্দ করেন। যেমনঃ শরীর থেকে ময়লা দূর করা, মাথা অথবা দাড়ি এবং দেহকে সাবান ইত্যাদি দ্বারা ধোয়াও মাকরুহ। মাথা বা দাড়ি চিরুনি দ্বারা আচড়ানোও মাকরুহ। মাথা বা দাড়ি এমনভাবে চুলকানো যেন চুল অথবা উকুন পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এটাও মাকরুহ। যদি আস্তে আস্তে চুলকায় আর চুল বা উকুন পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকে তবে তা যায়েজ। দাড়ি খেলাল করাও মাকরুহ। যদি কেউ করে তবে এমন ভাবে করবেন যেন একটা দাড়িও পড়ে না যায়। চাদর বা লুঙ্গিতে গিড়া দেওয়া অথবা সুই পিন ইত্যাদি লাগানো সুতা এবং দাড়ি দিয়ে বাধা ইত্যাদিও মাকরুহ। মহিলাদের এহরামের ব্যাপারে একটু আলোচনা করা দরকার। মহিলাদের এহরাম পুরুষদের এহরামের অনুরূপ। শুধু পার্থক্য এই যে, মহিলাদের মাথা ঢেকে রাখা ওয়াজিব এবং কাপড় দ্বরা মুখ আবৃত রাখা নিষিদ্ধ। আর সেলাইযুক্ত কাপড় পরিধান করা যায়েজ। মহিলাদের জন্য বেগানা পুরুষদের সামনে বেপরোতা হওয়া নিষিদ্ধ। সুতরাং চেহারার সাথে লাগতে না পারে এমন কিছু কপালের উপর বেধে তার উপর কাপড় ঝুলিয়ে দিতে হবে।
মহিলাদের জন্য এহরাম অবস্থায় মোজা, দস্তানা, অলংকার ইত্যাদি পরিধান করা যায়েজ তবে তা না পরিধান করাই উত্তম। মহিলাদের জন্য জোরে তালবিয়া পাঠ করা নিষিদ্ধ। শুধু নিজে শুনতে পান এমন জোরে পাঠ করবেন। মহিলারা তাওয়াফের সময় কখনো এস্তেবা ও রমন করবেন না  এবং সায়ী করার সময় সবুজ দুই বাতির মধ্যে দৌঁড়াবেন না। বরং নিজেদের স্বাভাবিক গতিতে চলবেন এবং যখন খুব ভীড় হবে তখন সাফা মারওয়ার উপরে আরোহন করবেন না। এমনি ভাবে পুরুষদের ভীরের ভিতরে হাজরে আসওয়াদ চুম্বনও করতে যাবেন না এমনকি এটাকে হাত দ্বারা স্পর্শও করবেন না। মাকামে ইব্রাহিমের ভিতরে দুই রাকাত নামাজও পড়বেন না। মহিলাদের জন্য মাথা মুন্ডন করা নিষিদ্ধ। সুতরাং এহরাম খোলার পর সমস্ত চুলের ঝুটি ধরে এর অগ্রভাগ হতে আঙ্গুলের এক থোরা পরিমাণ চুল নিজের হাতে কেটে ফেলতে হবে। কোন বেগানা পুরুষদের দিয়ে কাটানো নিষিদ্ধ। মহিলাদের জন্য হায়েজ অবস্থায়ও হজ্বের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করা যায়েজ শুধু  সায়ী ও তাওয়াফ করিবেন না।

Top